bangla random demo book
Written by: Istiaq Muhit
চলতি শতকের প্রথম দশকের মাঝামাঝি। তখন মেডিকেল কলেজে। ছাত্র, অর্থাৎ পিজিটি, মানে পোস্ট-গ্র‍্যাজুয়েট ট্রেনি। ক্যানসারের চিকিৎসা বিষয়ে কিছুটা জানাচেনার চেষ্টা করছি। কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, এইসব। সেই সময়ে যাঁদের চিকিৎসার সাথে যুক্ত থেকেছি, তাঁদের কয়েকজনের কথা খুব মনে আছে। ক্যানসার এমনই এক অসুখ, যেখানে জেতার পাশাপাশি হারের সংখ্যা অনেক। আবার, তিনবছরের ছাত্রজীবনে এমন সংখ্যাও কম নয়, যেখানে জয় নাকি পরাজয় ঠিক কোনটা ঘটেছে, সেই খবর পাওয়ার সুযোগটুকুও ঘটেনি। আউটডোর ইনডোর রেডিয়েশন মেশিনের মধ্যে দিয়ে যে বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রত্যেকদিন চিকিৎসা পেতেন, তাঁদের মধ্যে অনেক মুখই স্মৃতিতে ফিরে আসে। বারবার। কিছু কিছু মুখ প্রায় হন্ট করতে থাকে। সে স্মৃতি কখনও আনন্দের, প্রায়শই বিষাদের। যেমন ধরুন, হোসেন আলি। মুর্শিদাবাদের মানুষ। পরিস্থিতি এমনই, চিকিৎসা করানোর পক্ষে নিকটতম গন্তব্য কলকাতা। (তখনও বহরমপুরে মেডিকেল কলেজ চালু হয় নি।) কুচকুচে কালো গায়ের রঙ। তাগড়াই চেহারা। বয়স বছর পঞ্চাশেক। তাঁর সমস্যা, ইদানিং একটু ওজন কমেছে। রাত্রে জ্বরও আসে। গলায় আর বগলে কিছু কিছু ডেলা জাতীয় ফোলা। স্থানীয় ডাক্তারবাবু, সঙ্গত কারণেই, টিবি সন্দেহ করেছিলেন। কিন্তু, ছুঁচ ফুটিয়ে পরীক্ষায় দেখা গেল, লিম্ফোমা। অগত্যা কলকাতা। ক্যানসার বিভাগ। পরীক্ষানিরীক্ষায় দেখা গেল, অসুখ বেশ কিছুটা ছড়িয়েছে। পেটের ভেতরেও লিম্ফ নোড বেড়েছে। সব মিলিয়ে স্টেজ থ্রী। ক্যানসার কতখানি বেড়েছে, শরীরে কতোখানি ছড়িয়েছে, তার ভিত্তিতে অসুখের সারার সম্ভাবনা কতোখানি, সেই হিসেবনিকেশের অন্যতম এই স্টেজিং। সাধারণত চারটি ধাপ। হোসেনসাহেব আছেন তৃতীয় পর্যায়ে। অসুখটি লিম্ফোমা। নন-হজকিন্স লিম্ফোমা। তার মধ্যেও হাই গ্রেড। অর্থাৎ, দ্রুত ডালপালা ছড়ানোর স্বভাব। কিন্তু, আবার অন্যদিকে, লিম্ফোমা চিকিৎসায় সাড়াও দেয় চটপট। সেইসময়, ওই স্বল্প অভিজ্ঞতাতেই দেখেছি, দুই কি তিন দফা কেমো দিতেই লিম্ফোমা স্রেফ উধাও হয়ে গিয়েছে। বেশ কিছুটা অ্যাডভান্সড স্টেজেও লিম্ফোমা কিউরেবল, অর্থাৎ নিরাময়যোগ্য, এমনই জেনেছি। হোসেনসাহেবের গলা-বগলের ফোলা অনেকটাই কমে গেল প্রথম দফার কেমোথেরাপির পরে। কিন্তু, পরিস্থিতির আন্দাজ পাওয়া গেল দ্বিতীয় দফার পরে। ফোলা কমা তো দূরে থাক, তৃতীয় দফার কেমো নেওয়ার সময় দেখা গেল, ফোলা ফিরে এসেছে প্রথম দফার আগের পর্যায়ে। হোসেনসাহেব সচেতন মানুষ। বললেন, ফোলা প্রায় মিলিয়েই গিয়েছিল দ্বিতীয় কেমোর সপ্তাহখানেক বাদেই। কিন্তু, দুসপ্তাহ যেতে না যেতেই অসুখ বাড়তে শুরু করে। তৃতীয় দফা, মানে থার্ড সাইকেলের পরেও পরিস্থিতি তাই। অসুখ যেটুকু কমার, দুসপ্তাহের মধ্যেই ফিরে আসছে বাড়তি গতিতে। স্যারেরা আলোচনায় বসলেন। সিদ্ধান্ত হল, অসুখ যেহেতু ফিরে আসছে দু'সপ্তাহের মাথায়, কেমোথেরাপির সাইকেলের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনা যাক। এমনিতে তিন সপ্তাহের মাথায় দেওয়া হয়, কিন্তু এক্ষেত্রে দুটি কেমো সাইকেলের ব্যবধান হোক, ওই দুসপ্তাহ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম, ডোজ ডেনস (dose dense) থেরাপি। কথাটা শুনতে সহজ লাগলেও বিষয়টা একটু জটিল। কেমোথেরাপির দুটি দফার মধ্যে ব্যবধানের পেছনে কিছু আপোষ রয়েছে। আমরা ভাবতে ভালোবাসি, যে, কেমোথেরাপির বিষে শুধু ক্যানসার কোষ ধ্বংস হচ্ছে আর বাকি সব সুস্থ কোষ থাকছে বহাল তবিয়তে। কিন্তু, এ শুধুই উইশফুল থিঙ্কিং। ক্যানসার কোষের পাশাপাশি অসংখ্য সুস্থ-সবল কোষও বেঘোরে মারা যাচ্ছে কেমোর উপদ্রবে। কোন কোষ? শরীরের যেসব অংশে কোষ বিভাজন ঘটে দ্রুত, ক্ষতিগ্রস্ত হয় তারাই। যেমন, অস্থিমজ্জা বা বোন ম্যারো, যেখানে রক্ত বা রক্তের বিভিন্ন উপাদান তৈরী হয়। যেমন, অন্ডকোষ বা ডিম্বাশয়, যেখানে প্রজননের জন্যে প্রয়োজনীয় কোষ বিভাজিত হয়। যেমন, অন্ত্র বা ইন্টেস্টাইনের ভিতরের অংশ, যেখানে প্রতিনিয়ত পুরোনো কোষ নষ্ট হয়ে নতুন কোষ তার জায়গা নেয়। মৃত কোষের জায়গা নেওয়ার জন্যে আসবে নতুন কোষ, শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কিছুটা মেরামত হয়ে নিতে পারবে - শরীরের মধ্যেই বন্দোবস্ত মজুত, শুধু সেই বন্দোবস্ত কার্যকরী হওয়ার জন্যে সময় জরুরী। কিন্তু, দুই দফার মধ্যের ফাঁকে ক্যানসারটিও তো নিজেকে গুছিয়ে নেবে, সেইখানেও ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি সেরেসুরে উঠতে চাইবে। তাহলে?? ওই আপোষ। একটু ফাঁক থাকুক, যাতে শরীরটা একটু গুছিয়ে নিতে পারে, অথচ ক্যানসারটি যাতে বেড়ে না যেতে পারে। ডোজ ডেনস চিকিৎসা করতে গেলে এই ভারসাম্য রক্ষার খেলাটাই নড়বড়ে হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। হোসেন আলির ক্ষেত্রে ঝুঁকি নেওয়ার সাহস পাওয়া গেল, কারণ তাঁর সুঠাম স্বাস্থ্য। কিন্তু, রক্ত কমে গেলে, বিশেষত সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার মূল অস্ত্র শ্বেত কণিকা কমে গেলে তো মুশকিল। বিশেষত, কলকাতা থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে মুর্শিদাবাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সমস্যায় পড়লে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। অতএব, রক্ত বাড়ানোর ইঞ্জেকশনও জোড়া হল কেমোর পরের দিন। সেই সময়ে এই ইঞ্জেকশন বেশ দামী, হাসপাতালে পাওয়াও যায় না। হোসেনসাহেবের ছেলেকে বলা হল। খরচ শুনে ঘাবড়ে গেল সে। কিন্তু, বাবার চিকিৎসা। কোথা থেকে টাকার জোগাড় হল জানি না, কিন্তু, হোসেন আলির ইঞ্জেকশনের অভাব হল না।

Share With -